ঈদে কত টাকার সেমাই বিক্রি হয়
· Prothom Alo

নবতিপর সাকিনা খাতুনের দৃষ্টি হয়েছে ঘোলা, কানেও কম শোনেন। কাছে বসে উঁচু স্বরে কথা বলতে হয় তাঁর সঙ্গে। সেভাবেই ঈদের সেমাই রান্নার কথা জানতে চাইলে প্রথমে বেশ অবাক হন তিনি, পরক্ষণেই চোখেমুখে ফুটে ওঠে খুশির ঝিলিক। শিশু অবস্থায় মায়ের হাতের সেমাইয়ের স্বাদ থেকে শুরু করে নিজের সংসারে সেমাই রান্নায় তাঁর সুনামের কথা যেন হুড়মুড় করে স্মৃতিতে এসে ধরা দেওয়া শুরু করল।
ঈদুল ফিতরের চার দিন আগে গত ১৭ মার্চ কথা হয় সাকিনা খাতুনের সঙ্গে, রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তাঁর মেয়ে অধ্যাপক নাসরীন জেবিনের বাসায়। সাকিনা খাতুনের জন্ম ১৯৩৬ সালে। মুন্সিগঞ্জের মেয়ে হলেও বাবার চাকরির সুবাদে তাঁরা থাকতেন নারায়ণগঞ্জে। পরে সেখানেই বিএ পাস করেন, বিয়ে করেন, সংসার শুরু করেন।। স্বামী হাবিবুর রহমান ছিলেন নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি নিজেও দুই দশকের বেশি সময় নারায়ণগঞ্জের শিশুবাগ ইংলিশ স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।
Visit iwanktv.club for more information.
সাকিনা খাতুন জানান, ঈদের দিনের সেমাইয়ের জন্য তাঁরা আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করতেন। তাঁদের সময়ে যেমন বাজার থেকে সেমাই কিনে এনে রান্না হতো, তেমনি ময়দার খামির সঙ্গে নিয়ে দোকানে গিয়ে কলে সেমাই কেটে আনা হতো। সেই সেমাই রোদে শুকিয়ে বয়ামে ভরে রাখা হতো, ঈদের দিন ঘন দুধে রান্না হতো কলে কাটা সেই সেমাই। এ ছাড়া কাচের বাটিতে কুসুম গরম ঘন দুধ ঢেলে তাতে ছেড়ে দিতেন দোকান থেকে কিনে আনা লাচ্ছা সেমাই।
পারভীন, গাজীপুরের টঙ্গীর বাসিন্দাঈদে অন্তত সেমাইটা রান্না করা হয়।সাকিনা খাতুন বলেন, তাঁদের সময়ে ঈদের দিনের অত্যাবশ্যকীয় পদ ছিল সেমাই। ঘরে ঘরে সেমাই রান্না হতো। সচ্ছল পরিবারগুলোতে রান্না হতো লাচ্ছাসহ তিন–চার রকমের সেমাই, পরিবেশনও হতো পরিপাটি করে। আর দরিদ্র পরিবারগুলোতে রান্না হতো লম্বা সেমাই, এতে দুধের চেয়ে পানির পরিমাণ বেশি থাকত। বাটি–চামচে নয়, সেই সেমাই বাসনে নিয়ে হাত দিয়ে খেতেন দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা।
২০০০ সালে বাংলা একাডেমির ঈদ উৎসব সাময়িকীতে গবেষক ও বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের বর্ণনায় হাতে কাটা সেমাইয়ের বর্ণনা পাওয়া যায়। বাড়িতে রোজার শেষ দিকে শুরু হতো হাতে কাটা সেমাই বানানোর কাজ। এই সেমাইকে ‘সেওই’ বলা হতো। আরেক ধরনের ছোট ও মিহি সেমাই করা হতো, যেটির আঞ্চলিক নাম ছিল ‘জয়দানা’। ময়দার খামির বানিয়ে এই সেমাই দুই হাতে দুই আঙুলে রেখে কাটা হতো। বেশি ও ঘন দুধ দিয়ে রান্না করা ‘জয়দানা’ সুস্বাদু ও আভিজাত্যে ছিল অনন্য।
১৫ বছর আগে প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুরান ঢাকার বেশ কিছু বাড়িতে ছিল সেমাই কল। স্মৃতি হিসেবে সেসব রেখে দিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
বগুড়ার সেমাইপল্লিতে বিপুলসংখ্যক নারী সেমাই তৈরির কাজ করেনঈদ মানেই সেমাই
এ দেশে ঈদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত সেমাইয়ের নাম। পরিবারে রান্নার চুলা যদি থাকে, তবে ঈদে ধনী দরিদ্র সব বাড়িতে সেমাই থাকে ‘মাস্ট আইটেম’। কয়েক দিন আগে কারওয়ান বাজারে ২ নম্বর সুপারমার্কেটে দেখা হয়েছিল পারভীন নামের এক নারীর সঙ্গে, যিনি ৮ সদস্যের পরিবারের মধ্যে শুধু সদ্য বিধবা মেয়ের জন্য ঈদের পোশাক হিসেবে বোরকা আর স্যান্ডেল কিনছিলেন।
টঙ্গীর বাসিন্দা পারভীন অভাবের মধ্যেও বললেন, ঈদে অন্তত সেমাইটা রান্না করা হয়।
মূলত বগুড়া থেকে সবচেয়ে বেশি সেমাই সরবরাহ হয় সারা দেশে। এ ছাড়া রংপুর, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম থেকেও সেমাই দেশব্যাপী বিক্রি হয়। বেকারি সমিতির সদস্য ৭ হাজার প্রতিষ্ঠানেও ঈদ উপলক্ষে সেমাই বিক্রি হয়।
সব ধরনের পরিবারের জন্য শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সুপার শপে ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের প্যাকেট যেমন বিক্রি হচ্ছে, তেমনি বিক্রি হচ্ছে টুকরিতে রাখা খোলা সেমাই। মানভেদে সেসব সেমাইয়ের দাম কেজি হিসেবে ১০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা।
দেশে সেমাই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের আলাদা কোনো সংগঠন নেই। তবে বেকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমিতি রয়েছে। সমিতির সদস্য ৭ হাজার বেকারি প্রতিষ্ঠান। ঈদ উপলক্ষে এসব দোকানে সেমাই বিক্রি হয়।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি দ্রব্য প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেমাই এমন একটা পণ্য, যেটা ঈদের দিন রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিএমডব্লিউ গাড়ির মালিকের বাসায় রান্না হয়।’
জালাল উদ্দিন বলেন, সারা বছর যত সেমাই বিক্রি হয়, তার বেশির ভাগই বিক্রি হয় রোজার ঈদে। মূলত বগুড়া থেকে সবচেয়ে বেশি সেমাই সরবরাহ হয় সারা দেশে। এ ছাড়া রংপুর ও দিনাজপুরের সেমাই দেশব্যাপী বিক্রি হয়। তাঁদের বেকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ঈদ উপলক্ষে ২০ রোজা থেকে সেমাই রাখা শুরু করে। বছরের অন্য সময় তারা সেমাই বিক্রি করে না।
রাজধানীর বেইলি রোড ও পুরান ঢাকায় জালাল উদ্দিনের ক্যাপিটাল কনফেকশনারির দুটি বিক্রয়কেন্দ্রে বগুড়ার রয়েল প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ কেজি লাচ্ছা সেমাই কিনে এনে রাখা হয়েছে। এগুলোর কেজি ৮০০ টাকা।
সাইরুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি, বগুড়া চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিসারা বছর যত সেমাই বিক্রি হয়, তার বেশির ভাগই বিক্রি হয় রোজার ঈদে।কারওয়ান বাজারে ইউসুফ জেনারেল স্টোরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাচ্ছা ও লম্বা সেমাইয়ের প্যাকেট রাখা হয়েছে। এর মালিক মো. ইউসুফ আলী প্রথম আলোকে বলেন, অন্য সময় ১৫ দিনে দুটি সেমাইয়ের প্যাকেট বিক্রি করেন তাঁরা। ঈদ উপলক্ষে এখন দিনে দেড় হাজার সেমাইয়ের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে তাঁর দোকান থেকে।
চট্টগ্রামের চাক্তাই এলাকার সেমাই কারখানায় মেশিনে তৈরি হওয়া সেমাই শুকাতে নিচ্ছেন এক শ্রমিকসেমাইয়ের মোড়কে শাহরুখ খানের ছবি
১৬ মার্চ অভিজাত সুপার শপ ইউনিমার্টের গুলশান শাখায় গিয়ে সেমাইয়ের তাকের কাছেই ভিড় বেশি দেখা গেছে। এক ব্যক্তি কিনলেন ২০ প্যাকেট সেমাই। বিক্রয়কর্মী এক তরুণ তাঁর মাকে তাকের কাছে এনে জিজ্ঞেস করছিলেন, কী কী সেমাই লাগবে?
সেই তাকে দেশি নানা প্রতিষ্ঠানের প্যাকেট সেমাইয়ের সঙ্গে শোভা পাচ্ছিল বলিউড তারকা শাহরুখ খানের ছবিযুক্ত হলদিরামের ‘প্রভুজি’ সেমাই প্যাকেট ও কনটেইনার। ‘কিং খান’ এই সেমাইয়ের মডেল। ৪০০ গ্রামের প্লাস্টিকের কনটেইনারের দাম ৬৪৫ টাকা আর ৫০০ গ্রামের প্যাকেটের দাম ৬৪৫ টাকা; অর্থাৎ কেজি ১ হাজার ৩০০ টাকার মতো। রয়েছে পাকিস্তানি ব্র্যান্ড মেহরানের লাচ্ছা সেমাই। ১৫০ গ্রাম ওজনের এই সেমাইয়ের প্যাকেটের দাম ২৫০ টাকা; অর্থাৎ কেজি ১ হাজার ৬০০ টাকার বেশি।
এ ছাড়া দেশি ব্র্যান্ড ড্যান ফুডসের প্রিমিয়াম লাচ্ছা সেমাই ২৫০ গ্রামের প্যাকেট ২৮০ টাকা, মেট্রো ঘি লাচ্ছা সেমাই ৪০০ গ্রাম ওজনের প্যাকেটের দাম ২০০ টাকা, বোম্বে সুইটসের লাচ্ছা সেমাই ১৮০ গ্রাম ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্বপ্ন সুপারশপে মা ও শিশুকন্যাকে নিয়ে ঈদের বাজার করতে এসেছিলেন হাসানূর রাদিয়া নামের এক নারী। ১৭ মার্চ সেখানে এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ঈদে সেমাই রান্না করবেন তিনি। এ জন্য তিন প্যাকেট সেমাই কিনেছেন।
এই সুপারশপে কিষোয়ানের ৫০০ গ্রামের প্রিমিয়াম লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকা, এসিআইয়ের ২০০ গ্রাম লাচ্ছা সেমাই ২০০ টাকা, স্বপ্নের ১০০ গ্রাম প্যাকেটের লাচ্ছা সেমাই ৫৫ টাকায়।
এবারের ঈদ মৌসুম ঘিরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সেমাই বিক্রির আশা করছেন বগুড়ার সেমাই কারখানার মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রতি কেজি ১ হাজার থেকে ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। চিকন সেমাই কেজি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। ডালডায় ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের দর ৩০০ টাকা।
কারওয়ান বাজারের দোকানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, নামীদামি ব্র্যান্ডের সেমাই যেমন আছে, তেমনি আছে পলিথিনির বস্তায় রাখা খোলা সেমাই। অলিম্পিয়ার জাফরানি লাচ্ছা সেমাই ৫০০ গ্রাম ওজনের দাম ৭০০ টাকা, বনফুলের ২০০ গ্রাম লাচ্ছা সেমাই ৫০ টাকা, প্যারাগনের ২০০ গ্রামের লাচ্ছা সেমাই ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
খোলা লম্বা সেমাইয়ের কেজি ১০০ টাকা। দরদাম করলে তা ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হচ্ছে। খোলা লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা কেজি দরে। ফেসবুক ব্যবহার করে কিছু প্রতিষ্ঠানকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে টিনজাত লাচ্ছা সেমাই বিক্রি করতে দেখা গেছে।
চট্টগ্রামের চাক্তাই এলাকার কারখানায় শুকাতে দেওয়া কাঁচা সেমাইসেমাইয়ের বাজার কত টাকার
ঈদ উপলক্ষে কত টাকার সেমাই বিক্রি হয়, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। যেহেতু বগুড়া থেকে সবচেয়ে বেশি সেমাই সারা দেশে সরবরাহ হয়, তাই সেখানের কিছু আনুমানিক হিসাব দিয়ে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত ২০২২ সালের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ঈদকে কেন্দ্র করে বগুড়ায় চিকন ও লাচ্ছা সেমাইয়ের বিক্রি ছিল ৩০০ কোটি টাকার। ওই বছর সেমাইয়ের দাম চড়া ছিল। আগের বছর ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই ৮০০ টাকায় বিক্রি হলেও ২০২২ সালে বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়।
এবারের ঈদ মৌসুম ঘিরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সেমাই বিক্রির আশা করছেন বগুড়ার সেমাই কারখানার মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রতি কেজির দাম গত বছর ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা। এ বছর তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। আর গত বছর প্রতি কেজি ভাজা চিকন সেমাইয়ের দাম ছিল ১৪০ টাকা, এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। ডালডায় ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রতি কেজির দাম ছিল ২৮০ টাকা। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০০ টাকা।
বগুড়ার সেমাইপল্লিতে তৈরি হওয়া সেমাই মোড়কজাত করছেন এক নারীবগুড়া চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সাইরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বগুড়ায় সেমাই তৈরির ছোট–বড় হাজারখানেক কারখানা আছে। দুই ঈদকে কেন্দ্র করে আনুমানিক এক হাজার কোটি টাকার সেমাই বিক্রি হয়।
চট্টগ্রামের ওয়েলফুড, বনফুল, বনলতা ও মধুবনের তৈরি সেমাই সারা দেশে বিক্রি হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের সেমাই শুধু চট্টগ্রামে বিক্রি হয়। এবার ঈদে ১০০ কোটি টাকার বেশি সেমাই বিক্রি হবে বলে ধারণা দিয়েছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। তবে এ তথ্যের বিষয়ে সরাসরি কেউ মন্তব্য করতে চাননি।
অন্যান্যবারের মতো বিভিন্ন দামের সেমাই মুখে ঈদ আনন্দে মেতে ওঠার অপেক্ষায় এখন দেশবাসী। সাকিনা খাতুন যেমন বলছিলেন, সেমাইয়ের স্বাদ বাড়ায় ভালো মানের দুধ আর ঘন দুধ। তাতে পেস্তাবাদাম যোগ করলে স্বাদ আরও বাড়ে। তবে ঘন দুধ ও পেস্তাবাদাম ব্যবহার যাঁদের জন্য বিলাসিতা, তাঁরা হয়তো পানি দিয়ে পাতলা করে দুধে রান্না সেমাই তুলে দেবেন পরিবারের সদস্যের পাতে। একসঙ্গে ঈদ আয়োজনে যুক্ত থাকার আনন্দই বড় উৎসব।