ইরানের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলো কি যুদ্ধে জড়াবে?
· Prothom Alo

ইরানের একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়া সত্ত্বেও উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এখন পর্যন্ত অসীম ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শন করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার চলমান এই ছায়াযুদ্ধে তারা মূলত আত্মরক্ষামূলক অবস্থানকেই বেছে নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অদূর ভবিষ্যতে এই রাষ্ট্রগুলোর আক্রমণাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম।
তবে ইরান যদি সরাসরি কোনো বড় অবকাঠামো কিংবা বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা চালিয়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটায়, তবে হিসাব বদলে যেতে পারে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
যুদ্ধের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কোনো রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের শক্তিশালী বিমানবাহিনী ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালানোর সক্ষমতা রাখে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যুদ্ধে অংশ নেওয়াটা কি আদৌ কৌশলগতভাবে বুদ্ধিমানের কাজ হবে এবং এটি কি সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারবে? এ দুই প্রশ্নের কোনোটিরই উত্তর স্পষ্ট নয়।
সৌদি আরবের শক্তি ও সামর্থ্য
রয়াল সৌদি এয়ারফোর্স বা আরএসএএফ বর্তমানে প্রায় ৪৪৯টি যুদ্ধবিমান পরিচালনা করছে। এই বহরে রয়েছে এফ ফিফটিন, ইউরোফাইটার টাইফুন ও টর্নেডোর মতো আধুনিক সব যুদ্ধবিমান। আকাশপথে আক্রমণ চালানো থেকে শুরু করে প্রাথমিক সতর্কবার্তা এবং ইলেকট্রনিক গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে এই বাহিনী বিশেষভাবে সক্ষম। এমনকি তাদের কাছে প্রচুর চীনা ড্রোনও রয়েছে।
অস্ত্রশক্তির দিক থেকে সৌদি বিমানবাহিনী বর্তমানে ইরানের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ও ধ্বংসাত্মক। ন্যাটোভুক্ত অনেক উন্নত দেশের তুলনায়ও সৌদির আকাশশক্তি অত্যন্ত ঈর্ষণীয়। তবে তাদের প্রকৃত কার্যকারিতা মূলত এই দামি সরঞ্জাম ব্যবহারের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
যদি রিয়াদ ও আবুধাবি ইরানের বিরুদ্ধে জোটগতভাবে কোনো সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়, তবে তাদের পক্ষে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসা সম্ভব। তবে এখন প্রশ্ন থেকে যায় তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং ঝুঁকি নিয়ে।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা
সৌদি বিমানবাহিনীর যুদ্ধ পরিচালনার কিছুটা অভিজ্ঞতা আগে থেকেই রয়েছে। ১৯ শতকের আশির দশকে ইরান ও ইরাক যুদ্ধের সময় তারা মূলত প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করেছিল। তারা তখন ইরানের ভেতরে ঢুকে হামলা না করে কেবল নিজেদের আকাশসীমা রক্ষায় মন দিয়েছিল। এর বড় উদাহরণ ১৯৮৪ সালে ইরানের দুটি যুদ্ধবিমানকে সৌদি এফ ফিফটিন কর্তৃক গুলি করে ভূপাতিত করার ঘটনা। এরপর ১৯৯১ সালের ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’ বা মরুঝড়ে তারা প্রথম ব্যাপক পরিসরে অভিযান চালায়। তখন মার্কিনদের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক উড্ডয়ন বা সর্টি সম্পন্ন করেছিল সৌদিরাই।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হুতিদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান আশানুরূপ ফল দিতে পারেনি। সেখানে লক্ষ্যবস্তু সঠিকভাবে শনাক্ত করতে না পারার কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং রিয়াদকে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের পরিস্থিতি ইয়েমেনের মতো হবে না। ইয়েমেনে পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে থাকা গেরিলাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। পক্ষান্তরে ইরানে সৌদি আরবের লক্ষ্যবস্তু হবে সুনির্দিষ্ট এবং প্রকাশ্য স্থাপনাগুলো। তা ছাড়া মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এখন অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আরব আমিরাতের ভূমিকা
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে আরব আমিরাত অত্যন্ত পারদর্শী হয়ে উঠেছে। ইয়েমেন কিংবা লিবিয়ায় লড়াই করার পাশাপাশি ২০০৯ সাল থেকে তারা মার্কিন নেভাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত ‘রেড ফ্ল্যাগ’ মহড়ায় নিয়মিত অংশ নিচ্ছে। আরব দেশগুলোর মধ্যে আমিরাত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মার্কিন সামরিক সহায়তা ব্যবহার করেছে। ইয়েমেন অভিযানে তাদের এফ সিক্সটিন যুদ্ধবিমানগুলো সৌদি বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি নিপুণ লক্ষ্যভেদী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
যদি রিয়াদ ও আবুধাবি ইরানের বিরুদ্ধে জোটগতভাবে কোনো সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়, তবে তাদের পক্ষে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসা সম্ভব। তবে এখন প্রশ্ন থেকে যায় তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং ঝুঁকি নিয়ে।
ইরানে ট্রাম্পের হামলা চীনের জন্য অনেক সুযোগ খুলে দিয়েছেআক্রমণের উৎসাহ
মূলত দুই কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো পাল্টা আক্রমণের চিন্তা করতে পারে। প্রথমত ইরানকে এই বার্তা দেওয়া যে তার আক্রমণের ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া আছে। কেবল ডিফেন্স বা আত্মরক্ষায় মনোযোগী হওয়া মানে হচ্ছে ইরানকে কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই আক্রমণ চালিয়ে যেতে প্রশ্রয় দেওয়া।
দ্বিতীয়ত কেবল ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে অনেক ব্যয়বহুল। ইরানের ড্রোন ও মিসাইল তৈরিতে খুব কম খরচ হয়; কিন্তু সেগুলো প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও আরবদের বিশাল মূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করতে হয়। তদুপরি বর্তমানে আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের এক বড় সংকটের কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কারণ, মার্কিনদের অগ্রাধিকার তালিকায় এখন রয়েছে ইসরায়েল ও ইউক্রেন।
ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
পাল্টা হামলার পথ অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ইরান ক্রুদ্ধ হয়ে সৌদি বা আমিরাতের বিমানবন্দর, অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং সমুদ্রের লোনাপানি বিশুদ্ধ করার মতো জীবন রক্ষাকারী বড় স্থাপনায় হামলা চালিয়ে অপূরণীয় ক্ষতি করে দিতে পারে।
আরেকটি বড় চিন্তার বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি যুদ্ধ জয়ের ঘোষণা দিয়ে লড়াই থেকে সরে দাঁড়ান তবে আরব দেশগুলো একাই বড় বিপদের মুখে পড়ে যাবে। তা ছাড়া ইরানি সামরিক গোষ্ঠীদের সৌদি আরব, বাহরাইন বা কুয়েতের ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্লিপার সেলগুলো তখন দেশের ভেতরে নাশকতা চালিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।
মে মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরে বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ১৩ মে, ২০২৫তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গাটি রাজনৈতিক। আরব শাসকরা খুব ভালোভাবেই জানেন যে বর্তমানে আরব বিশ্বের জনগণের কাছে ইসরায়েল একটি বৈরী দেশ। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পক্ষে অবস্থান নিয়ে কোনো মুসলিম দেশ যদি ইরানের বিরুদ্ধে লড়তে যায়, তবে সেই দেশের জনসাধারণের কাছে নেতার জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকতে পারে।
দেশীয় অস্থিতিশীলতার ভয়েই আরব রাজারা লড়াইয়ে শামিল হওয়া থেকে হয়তো পিছু হটবেন।
সার্বিক বিচারে উপসাগরীয় দেশগুলো বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থেকে নিরাপত্তা টেকসই হচ্ছে না, আবার সরাসরি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লে তার ফল হবে চরম অনিশ্চিত ও বিধ্বংসী। ওয়াশিংটনের আগের সেই নিরাপত্তা অঙ্গীকার নিয়েও এখন তাদের মনে তীব্র সংশয় রয়েছে। তাই আপাতত তাদের সামনের পথটি পাথর আর কাচের খণ্ডের মধ্যে হাঁটার মতোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিলাল ওয়াই সাব চ্যাথাম হাউসের মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা কর্মসূচির অ্যাসোসিয়েট ফেলো
ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাংক চ্যাথাম হাউস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত