নিভৃত পল্লিতে মোগল আমলের প্রাচীন মসজিদ, এখনো হয় নিয়মিত নামাজ

· Prothom Alo

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ি ইউনিয়নের গিলাবাড়ি গ্রামের মোগল আমলের প্রাচীন মসজিদটি কয়েক শ বছর ধরে ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে টিকে আছে। নিভৃত পল্লিতে অবস্থিত এ মসজিদে এখনো নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। প্রতিদিন আজানের ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে আশপাশের এলাকা।

স্থানীয়দের মতে, কয়েক শতাব্দী আগেও যেমন ধর্মীয় কার্যক্রম চলত, এখনো প্রায় একই ধারায় তা অব্যাহত আছে।

Visit fishroad-app.com for more information.

গিলাবাড়ি মসজিদের মূল অবকাঠামোর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪২ ফুট ও প্রস্থ ১৭ ফুট। চৌহদ্দিসহ প্রায় সাত শতক জমির ওপর মসজিদটির অবস্থান। তিনটি বড় গম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাচীন স্থাপনাটিতে মোট ১২টি মিনার আছে। মসজিদের সামনে থাকা মূল ফটকে আছে আরও তিনটি মিনার। নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়েছে প্রাচীনকালের চ্যাপটা ইট, চুন ও ইটের সুরকির মিশ্রণ, যা মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য বহন করে।

মসজিদের চত্বরে মূল ফটকের সামনে একটি প্রাচীন ইঁদারা (কুয়া) এখনো টিকে আছে। অতীতে এখান থেকে মসজিদের প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করা হতো। তবে দীর্ঘদিন ধরে এটি আর ব্যবহার করা হয় না। বর্তমানে মুসল্লিদের ওজু ও অন্যান্য প্রয়োজনে বিকল্প পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মসজিদের সামনে ওই প্রাচীন ইঁদারার পাশে দুটি লোহার দণ্ডে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি সাইনবোর্ড লাগানো আছে। সাইনবোর্ডে উল্লেখ আছে, এটি একটি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ এবং আইন লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রত্নসম্পদ ও সংরক্ষণ শাখার ওয়েবসাইটে গিলাবাড়ি ঐতিহাসিক প্রাচীন মসজিদ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে, ২০২২ সালের ১ আগস্ট জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে মসজিদটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গিলাবাড়ি ঐতিহাসিক প্রাচীন মসজিদটি সম্ভবত মোগল আমলে নির্মিত এবং এটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এর কাঠামো ইট, চুন ও সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা বিভাগের সাবেক ছাত্র এবং গিলাবাড়ি গ্রামের সন্তান আবদুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, নির্মাণশৈলী, নির্মাণ উপকরণ ও অন্যান্য অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের কারণে গিলাবাড়ি মোগল আমলের প্রাচীন মসজিদটি এখনো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি জানান, মসজিদের বাইরের দেয়ালের সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য পাকিস্তান আমলে একবার এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আমলে একবার প্লাস্টার করা হয়। এ ছাড়া কয়েকবার সাদা রং করা হয়েছে। তবে মসজিদের মূল আকৃতি ও প্রকৃতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে প্রাচীন স্থাপনার নান্দনিকতা এখনো অটুট রয়েছে।

মসজিদের চত্বরে মূল ফটকের সামনে একটি প্রাচীন ইঁদারা (কুয়া) এখনো টিকে আছে। অতীতে এখান থেকে মসজিদের প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করা হতো

ঐতিহাসিক এই মসজিদ সংরক্ষণের উদ্যোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আবদুল্লাহ আল মাহফুজ। তিনি কয়েক বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত আবেদন করেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মসজিদটি পরিদর্শনে আসেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের তৎকালীন পরিচালক নাহিদ সুলতানা, রংপুর তাজহাটের জমিদারবাড়ির প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরের কাস্টডিয়ান মো. হাবিবুর রহমান এবং বগুড়া কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক মো. সাইফুজ্জামান।

গিলাবাড়ি মোগল আমলের প্রাচীন মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. এরশাদ আলম (৮৩) বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাইনবোর্ডটি ২০২৪ সালে লাগানো হয়েছে। তিনি জানান, এলাকার মুসল্লিদের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকেও মানুষ এখানে নামাজ পড়তে আসেন। অনেকেই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে এসে ছবি তোলেন ও ভিডিও ধারণ করেন।

গিলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও মসজিদের মুসল্লি মো. নুর রহমান (৯০) ও মো. হামিদার রহমান (৭৫) একই কথা জানান। তাঁদের মতে, কয়েক শ বছরের পুরোনো এই মসজিদ এলাকায় ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

মসজিদের সামনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি সাইনবোর্ড লাগানো আছে

গিলাবাড়ি মসজিদের ইমাম মো. সোহেল ইসলাম ও মোয়াজ্জিন নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘কয়েক শ বছরের পুরোনো এ মসজিদের দায়িত্ব পালনের কাজকে সম্মানজনক ও আল্লাহ পাকের অশেষ রহমত বলে মনে হয়। আল্লাহর ঘর, মসজিদ। এত বছর হলো, এখনো টিকে আছে।’

‘লালমনিরহাট জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক এবং লালমনিরহাট জেলা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মো. আশরাফুজ্জামান মণ্ডল সবুজ বলেন, গিলাবাড়ি মোগল আমলের প্রাচীন মসজিদ লালমনিরহাটের একটি ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে। লালমনিরহাটের নিদারিয়া মসজিদ, সাহাবি যুগের হারানো মসজিদ, মাটিয়া মসজিদ ও জেলা শহরের পুরান বাজারে পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদ ও মন্দিরও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে পরিচিত।

চৌহদ্দিসহ প্রায় সাত শতক জমির ওপর মসজিদটির অবস্থান। তিনটি বড় গম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাচীন স্থাপনায় মোট ১২টি মিনার রয়েছে

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে মসজিদটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন মসজিদ, মন্দির ও গির্জা আছে, যেগুলো দেখতে স্থানীয়দের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ আসেন। এতে জেলার পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জেলা প্রশাসক আরও বলেন, লালমনিরহাটের তিনটি প্রাচীন মসজিদ—নিদারিয়া মসজিদ, সাহাবি যুগের হারানো মসজিদ ও গিলাবাড়ি মসজিদের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে আশপাশে পর্যটন সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

Read full story at source