জমজমাট হয়ে উঠেছ তারা উদ্যোক্তা মেলা

· Prothom Alo

আলোকি কনভেনশন সেন্টারে জমে উঠেছে “তারা উদ্যোক্তা মেলা”। নানা পণ্যে সজ্জিত স্টল, উৎসাহী ক্রেতা আর প্রাণবন্ত নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতিতে মেলায় তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।

Visit sportnewz.click for more information.

শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি। দুপুরে আমি যখন আলোকি কনভেনশন সেন্টারে “তারা উদ্যোক্তা মেলাতে” পৌঁছাই ততক্ষণে মেলা ঘুরে গেছেন প্রধানমন্ত্রীকন্যা জাইমা রহমান। তাঁর উপস্থিতি নারী উদ্যোক্তাদের নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। জাইমা রহমান প্রায় দুই ঘন্টা মেলায় ছিলেন। ঘুরে ঘুরে নানা কিছু পছন্দ করে কিনেছেন। আবার উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলাপ করে তাদের কাজকর্ম ও চ্যালেঞ্জ নিয়েও কথা বলেছেন। কাজেই আমি যখন কোনো স্টলে যাচ্ছিলাম তখনই কেউ না কেউ বলেছেন যে জাইমা রহমান তাঁর স্টল থেকে কেনাকাটা করেছেন!

এবারের মেলার প্রথম দিন তথা গতকাল শুক্রবারই দারুনভাবে জমে গেছে। শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার সময় যখন মেলায় নতুন কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল না তখনও গেটের বাইরে অনেকে অপেক্ষমান ছিলেন। এদের অনেকেই আজ সকালে এসে হাজির হয়েছেন। মিতার গল্পের উদ্যোক্তা মাসুমা আক্তার মিথিলা জানিয়েছেন যে, শুক্রবার মেলার শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর স্টলে ক্রেতা-দর্শক ছিলেন। তাদেরকে এক প্রকার জোর করে বিদায় করতে হয়েছে। উদ্যোক্তারা বললেন যে, রাত ১১টা পর্যন্ত বলতে গেলে তেমন একটা বিশ্রামের সুযোগ তাঁরা পাননি। ফলে বাসায় গিয়ে কেউ কেউ পরেরদিনের প্রস্তুতিতে কিছুটা কম সময় দিতে পেয়েছেন। আজ সকালেই আবার হাজির হয়েছেন ৮৮ জন নারী উদ্যোক্তা।

মূল কনভেনশন হলের উল্টোদিকে কাঁচের ঘরে গিয়ে দেখা হলো রঙ্গিমার উদ্যোক্তা রুবানা করীমের সঙ্গে। রুবানা ২০১৬ সাল থেকে ফেসবুক পেজ খুলে তাঁর উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজস্ব ডিজাইনে মেয়েদের পোশাক করেন। ফিউশনই মুখ্য। জানালেন, ‘আমি প্রথমে কাপড় ডাই করে আমার মতো করে নেই। তারপর সেখানে কাজ করি।’ হাতের কাজের এই স্টলে হাতে বানানো গয়নাও পাওয়া যাবে।

বাগানওয়ালা

মূল কনভেনশন হলে ঢুকলেই হাতের ডানপাশে মেলার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ “বাগানওয়ালা”। উদ্যোক্তা নুসরাত জাহান নিশি জানালেন যে, তাদের এখানে প্রায় ৫০০ প্রজাতির ইনডোর প্ল্যান্ট রয়েছে। মিরপুরে একটি বাগানে তিনি এই প্ল্যান্টগুলোর পরিচর্যা করেন। তাঁর কাছে আছে বেশ কিছু এক্সক্লুসিভ ইনডোর প্ল্যান্ট যেমন এনকুরিয়াম, ফিলাড্রেনড্রেন, এগলোনিমা, সিনডানসেটের নাম শুনলাম।

দর্শক-ত্রেতাদের বাড়তি আকর্ষণের জায়গা হলো টেরারিয়াম। টেরারিয়াম হলো কাঁচের জারের মধ্যে বিশেষ কিছু প্ল্যান্টের পরিচর্যা। এই গাছগুলো খুব ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে। এজন্য এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ সহজ। মাসে মাত্র দুইবার পানি পাল্টে দিলেই হয়।  এই স্টলে   ৮০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা দামের টেরারিয়াম রয়েছে।
নিজের ডিজাইনের গয়না নিয়ে এসেছেন উদ্যোক্তা মেহজাবিন। তাঁর স্টলের নাম গ তে গহনা। গোল্ডপ্লেটেড মেটালের নানা রকম গয়না রয়েছে সেখানে। ঢাকা ও সাভারের কারিগরদের দিয়ে নিজের ডিজাইনে কাজ করিয়ে নেন তিনি। ক্রেতা-দর্শকদের আগ্রহ দেখে উৎফুল্ল তিনি।

প্রিয়ভাষিণী

ফুডজোনে গিয়ে আলাপ হলো “নিত্য চাহিদার” উদ্যোক্তা পাবনার রীমা পারভীনের সঙ্গে। পাবনার বিখ্যাত কুমড়ো বড়ি, ঘরে বানানো ঘি ছাড়াও তাঁর স্টলে রয়েছে একগাদা খাবার। এর মধ্যে কয়েকটি হলো -  খেজুরের রসের পাটালি, গুড়, বাদাম, কিশমিশ, সাগুর পাপড়, মুগ ডালের পাপড়, সিরিঞ্জ পিঠা, জিকজ্যাক পাপড়, যবের ছাতু, মিক্সড ছাতু, ৫ রকমের মাখন, তেঁতুল ও রসুনের কয়েক রকমের আচার। ক্রেতারা বেশ আগ্রহ নিয়ে সংগ্রহ করছেন বলে জানালেন উদ্যোক্তা রীমা।

ফুড কোর্টেই “চাওয়ালী” নামে চায়ের শপ। এর উদ্যোক্তা অন্যন্যা রুমা বললেন, আমাদের দেশে কফি বললে লোকে একটা অভিজাত শপ, সুন্দর জায়গায় বসে কফি পানের অভিজ্ঞতার কথাই মনে করে। কিন্তু চা বললে টঙের দোকান, মামুর দোকানের কথা মনে হয়। পথ চলতি কোথাও দাঁড়িয়ে বা টুলে বসে চা খেয়ে নেওয়া। কিন্তু জনপ্রিয় ও সহজলভ্য হলেও চাও একটি আয়েশী পানীয়। সেজন্য তিনি ধানমন্ডিতে গড়ে তুলেছেন তাঁর চায়ের দোকান। যেখানে আপনি সময় নিয়ে বসে চায়ের সঙ্গে টা নিয়ে গল্প করতে পারবেন, বই পড়তে পারবেন।

গ’তে গহনা

মেলায় নিয়ে নিয়ে এসেছেন কয়েক রকমের চা। তবে তাঁর স্টলে আপনি পাবেন দুটি ভিন্ন রকমের গিফট আইটেম। এর একটি হলো কাঠের বক্সে তিন রকমের চায়ের ছোটো বোতলসহ গিফট বক্স। জন্মদিনে বা বিবাহ বার্ষিকীতে যারা ভিন্ন রকম উপহার দিতে চান তাঁরা এটি ভাবতে পারেন। পাশাপাশি রয়েছে ছবিওয়ালা কুশন। পছন্দের ছবি দিয়ে কুশন কভার বানিয়ে দেন তিনি ২৪ ঘন্টার মধ্যে। মেলাতে কেনার চেয়েও বেশি জোর দিচ্ছেন নেটওয়ার্কিং ও পরিচিতি বাড়াতে। বললেন, আমি এ্সেছি আমার মার্কেটিংয়ের জন্য।

শান্ত মরিয়াম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিজাইনে পড়াশোনা করা এমব্লেমের উদ্যোক্তা ফারাহ দীবারও প্রাণের যোগাযোগ পাবনার সঙ্গে। তাঁর ডিজাইনের পোশাকের হাতের কাজ যেমন পাবনাতে হয় তেমনি সেখানকার কারখানাতেই তাঁর পোশাকের সেলাইয়ের কাজ হয়। মূল কনভেনশন হলে একটি মঞ্চ আছে। সেটির সঙ্গে লাগোয়া একটি কাঠের কাজের স্টল – ক্র্যাফট প্যান্ডা।

ক্র্যাফট প্যান্ডা

সেখানেই গেলেই আপনি এমনিতেই মুগ্ধ হয়ে যাবেন। কাঠের তৈরি নানা রকম টেবিলওয়্যার ও কিচেনওয়্যার দিয়ে স্টল সাজিয়ে নিয়েছেন। এর উদ্যোক্তা নাজনীন আখতার। পাশাপাশি কিছু কাঠের ঘর সাজানোর উপকরণও রয়েছে। মোহাম্মুদপুরে নিজস্ব কারখানাতেই সব তৈরি করেন বলে জানালেন তিনি। এই স্টলের আশেপাশেই আর একটি ভিন্ন ধরণের স্টল হলো ডিআইইয়ার স্টুডিও। দীর্ঘদিন ধরে হোসনে আরা বিন্নী হাতে তৈরি সাবান, ক্রিম তৈরি করছেন আর করছেন লাইফস্টাইল প্রোডাক্ট। তার স্টলে আছে অসম্ভব সুন্দর  সব পণ্য।    

নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসার উন্নতিতে কাঠামোগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে ব্র্যাক ব্যাংক তারা। তাদের দুইটি ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ রয়েছে। একটি হলো ১২ সপ্তাহব্যাপী উদ্যোক্তা ১০১। এখানে প্রতি শনিবার তিনঘন্টার একটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কোর্স শেষে অংমগ্রহণকারীরা ব্যাচভিত্তিক মেলাতে অংশ গ্রহণের সুযোগ পান এবং সবশেষে নিজেদের পণ্য ও সেবাকে প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে তুলে ধরে জিতে নিতে পারেন নগদ পুরস্কার। অন্যদিকে  রয়েছে প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসার বিকাশ ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো তিনদিন ব্যাপী কর্মশালা “আমরাই তারা”।  এই দুই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন এমন বেশ কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হল মেলায়। যদিও মেলায় স্টল পাবার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের কোনো সম্পর্ক নেই।

নিত্য চাহিদা

তিনদিনব্যাপী মেলার প্রথম দিন ও দ্বিতীয় দিন দুপুর পর্যন্ত কেনাকাটায় অধিকাংশ উদ্যোক্তা খুশি বলে জানিয়েছেন আমাকে। অনেকেই বলেছেন যে, তাঁরা আশাতীত ব্যবসা করতে পেরেছেন এবং চান যেন পরের দেড়দিনও সেটা অব্যাহত থাকুক। উল্লেখ্য, এই মেলায় স্টলের জন্য কোন ফি দিতে হয় না। উদ্যোক্তাদের জন্য ইফতার ও রাতের খাবারের ব্যবস্থাও রেখেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ছবি: লেখক

Read full story at source